"তোর বড় হয়ে ওঠা, পড়াশোনা, এই জামাকাপড় এমনকি তোর মুখের অন্ন টাও তাদের করূণায় আসে।
তাই এই ব্যাপারে তোর আপত্তি কোনভাবেই মানা যাবেনা। তোর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতেই হবে।"
কথাগুলো মায়ের মুখে শুনে আমার পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এমন কিছুর জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। এখন আমি রনিকে কি বলবো?
কিন্তু এখন আমি কিইবা করতে পারি।
আমার মামাতো ভাই নিজামের সাথে আমার বিয়ের সকল কথাবার্তা চূড়ান্ত। আর এর পিছনে রয়েছে এক সুদীর্ঘ ইতিহাস। যার সাথে মিশে আছে আমার বেঁচে থাকা, বেড়ে ওঠা এবং জীবনযাপনের গল্প।
আমার বয়স যখন মাত্র ৩, তখন আমার বাবা মারা যান। আমার মা তখন আমি আর আমার ২ মাস বয়সী ছোটবোন কে নিয়ে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে পরে যান।
কিভাবে কি হবে?
আর কিভাবেই বা বাঁচিয়ে রাখবেন আমাদের দুই বোনকে?
আমার বাবা এমন কোন সঞ্চয়ও রেখে যেতে পারেন নাই। সেই মুহূর্তে আমার মা তার ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। আমার মামি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের মাঝে একজন। তার নিজের স্বল্প আয়ের সংসারে আরো তিনটি মুখের অন্নের সংস্থান কে উনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে হাসিমুখে মেনে নিলেন। আমার মা বা আমরা কেউই তাকে কোনদিন আমাদের সাথে কটুমুখে কথা বলতে শুনিনি। বরং হাসিমুখে আমাদের সকল প্রয়োজন নিজে মিটিয়ে দিতেন।
আমি যখন অনার্স এ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখছিলাম, তখন উনি নিজে উনার সঞ্চিত ২ লক্ষ টাকা মায়ের হাতে তুলে দেন আমার পড়াশোনার জন্য।
আর আজ সেই মহিলা উনার একমাত্র ছেলের জন্য আমাকে চেয়ে আমার মায়ের কাছে হাত পেতেছেন। উনি এতোকিছুর পর আমাকে দাবী করার অধিকার রাখেন, কিন্তু উনি আমার মায়ের কাছে এসেছেন আমাকে তাদের ঘরে নেয়ার অনুরোধ নিয়ে।
আমার মামাতো ভাই নিজাম সুদর্শন এবং যোগ্য একজন ছেলে। লম্বা, সুঠাম দেহের মানুষ। বয়সে আমার চেয়ে বছর দুই এর বড় হবেন। স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ড এ পড়াশোনা করছেন। আর কয়েকদিন পরেই দেশে ফিরবেন, আর তখনই আমাদের বিয়েটা সেরে ফেলতে চান।
আমাকে বউ বানানোর ব্যাপারে নাকি নিজাম ভাই নিজেই উনার মাকে অনুরোধ করেছেন। আমি দেখতে মোটামুটি লেভেলের সুন্দরী, পাতলা গড়ন আর লম্বায় ৫ ফুটের কাছাকাছি। আমার ব্যাপারে বললাম কারণ আমার মতো মেয়েকে তার পছন্দ হবার কোন কারণই থাকেনা।
অপরদিকে আমার রিলেশন আমারই ক্লাসমেট রনির সাথে। মাত্র ৫ দিন আগে আমাদের সম্পর্কের শুরু। অনেকদিন যাবত আমাকে প্রপোজ করলেও আমি মাত্র ৫ দিন আগে তার প্রস্তাবে সম্মতি দিলাম। আর আজ পাঁচ দিন পরেই তাকে মানা করে দিতে হবে মনটা কেঁদে উঠছে।
আজই মাত্র আমরা প্রথমবারের মতো একত্রে বাহিরে সময় কাটিয়ে আসলাম। আমরা নৌকায় ঘুরে বেড়িয়েছি। রনি আমার হাতটা শক্ত করে ধরে নৌকায় বসে ছিলো।
আর বলেছিলো "অনেক সাধনার পরে তোমার হাতটা পেয়েছি, জীবনেও ছাড়তে পারবো না এটা।"
কিন্তু আজ আমি এর শেষ এর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
কিভাবে ওকে বলবো, এই হাতের প্রতি ওর অধিকার শুধুমাত্র একটা বিকেলের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো।
আজ আমার বিয়ে
আমি এখনও রনিকে বলতে পারি নাই আমার বিয়ের কথা। গতকাল রাতেও ওর সাথে কথা হয়েছে। খুব শক্ত হয়ে ছিলাম আমি। কিছুই বুঝতে দেই নি ওকে। ওর সাথে কথা শেষ করে আমি নিজের মোবাইলের সিম টা ফেলে দিয়েছি। খুব কান্না পাচ্ছিলো, কিন্তু পাশে ছোট বোন থাকার জন্য কাঁদতে পারিনি।
সন্ধ্যায় হুজুর আমাদের বিয়ে পড়িয়ে দিলেন। আমি একটা নিশ্চুপ পুতুলবউ হিসেবে সব করে যাচ্ছি। ভেতরের কষ্ট চাপা রেখে আছি একটা অনুভুতিহীন পুতুলের মতোন।
আমি বাসরঘরে বসে আছি, ফুলে ফুলে সুন্দর করে সাজানো একটা বাসর। বিছানায় ফুলের পাঁপড়িতে লেখা "N+T"।
কিছু সময় পর নিজাম এসে আমার ঘোমটা ছড়ালে আমি হু হু করে কেঁদে উঠি। আমার ভেতরের পাথর টা আর শক্ত রাখতে পারলাম না। ও কান্নার কারণ জানতে চাইলে আমি সবকিছু স্বীকার করে নেই।
ও কিছুই না বলে চুপ করে বিছানার একপাশে শুয়ে পড়লো। আমি একটা নিশ্চুপ মৃতদেহের মতো পড়ে রইলাম বিছানার অন্যপাশে।
পরদিন একটা মাধ্যমে রনির খবর নিয়ে যা জানতে পারলাম, তাতে আমি আরো নিশ্চুপ হয়ে গেলাম।
"রনি বিবাহিত, ও তিনবছর আগে প্রেম করে একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।"
খুব অবাক হলাম, একই ক্লাসে পড়াশোনা করা সত্বেও একবারও বুঝতে পারলাম না। এমনকি সম্পর্কে জড়ানোর পরও বুঝতে পারলাম না এই ব্যাপারে।
নিজের ভাগ্যকে চপেঘাত করে কান্নার শক্তিটুকুও হাড়িয়ে ফেললাম। আমি নিজামকে হারালাম সব স্বীকার করে নিয়ে আর রনি? সেতোহ আমার ছিলই না।
এভাবেই দিন যাচ্ছিলো, একই ঘরে দুইটা জীবন্ত মৃতদেহ একই বিছানার দুইপাশে শুয়ে কাটাতে লাগলাম। কিছুদিনের মাঝেই টের পেলাম আমি নিজামের হয়ে গেছি। এখন আমার সত্বার পুরোটা জুড়েই নিজাম আছে।
আর এটাই হওয়া উচিত ছিলো আমার জন্য।
আজ আমরা সুখী, বড্ড সুখী। কিছুদিন পর আমাদের ভালবাসার পুরষ্কার আসবে এই পৃথিবীতে। আমার মামী (বর্তমানে শ্বাশুরী) আমার সামনে নানা রকমের খাবার সাজিয়ে রেখে গেছেন। নিজাম আমার তলপেটে হাত রেখে তার বাবুকে আদর করে যাচ্ছে।
আমার আর নিজামের বাবুকে।
আসলে পৃথিবীতে সকল আশা পূর্ণ হতে নেই। কিছু ব্যাপার উপরওয়ালার হাতে ছেড়ে দিতে হয়। উনি যা করেন তাতেই আমাদের মঙ্গল নিহিত থাকে।
Congratulations @smileytaha! You have completed the following achievement on the Hive blockchain and have been rewarded with new badge(s) :
You can view your badges on your board And compare to others on the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOP
To support your work, I also upvoted your post!
Support the HiveBuzz project. Vote for our proposal!