তখন সাঁতার জানতাম না। গোসলের আগে পুকুরে গিয়ে বন্ধুর গলা ধরে সাঁতার শিখতাম। পুকুর থেকে উঠে বাড়ি ফেরার পথে আপুর পরামর্শে বন্ধুকে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে বাড়ি ফিরতাম। অনেক সময় বন্ধুর সাথে মাছ ধরতে যেতাম। খাবারের সময় বন্ধুকে ছাড়া যেন খাবারের মজাটাই আসত না। কেউ কাউকে ছাড়া খেতে বসতাম না। আমাদের খাওয়া-দাওয়া, হাঁটাচলার ভঙ্গিটাও ছিল একরকম। রোজ বিকেলে বন্ধুর সাথে চা-ষ্টলে যেতাম। বন্ধু ছিল ইংরেজীর শিক্ষক। তাই পথে বন্ধু আমায় ওয়ার্ড মিনিং শেখাত। ইংরেজীকে কেন্দ্র করে বন্ধুর সাথে রাস্তায় একটা ঝামেলা বেধে যেত। কোনো একটা সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে বন্ধুকে খুব মারতাম। কিন্তু এর জন্য বন্ধু আমাকে কিছুই বলত না। বন্ধুকে মারার জন্য আম্মু আমাকে গালি দিলে বন্ধু আম্মুকে গালি দিয়ে বলত, "আমাকে মারছে, তুমি কি ব্যথা পাইছো?" পরে আম্মু আর কিছু না বলল সেখান থেকে চলে যেত। রাতে বন্ধুর মুখে গল্প না শুনলে ঘুম তো দূরের কথা যেন দুচোখের পাতা এক করতে পারতাম না। সেই দিনগুলো ছিল খুব চমৎকার। হঠাৎ বন্ধু একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন যে তার লিভার জন্ডিস হয়েছে। শুনে যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। লিভার জন্ডিস এমন একটা রোগ যেটা পুরোপুরি ভালো হয় না। বন্ধুর অবস্থার ক্রমেই অবনতি হতে লাগল। অনেক বড় বড় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করিয়েও তার অবস্থার কোনো উন্নতি হলো না। একদিন এলো সেই বেদনাদায়ক মুহুর্ত। সময়টা ছিল ভোর ৫ টা। দিনটা ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫। একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। হঠাৎ সবার চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ছুটে গেলাম বন্ধুর কাছে। সেখানে গিয়ে বন্ধুকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে দেখলাম। সেই দৃশ্য এখনো চোখের সামনে ভাসে। বন্ধুর শেষ সময়ে তার সাথে কথা বলার মতো সৌভাগ্য হয়নি কিন্তু তিনি আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় বুঝিয়েছিলেন বন্ধুত্ব চিরস্থায়ী। আসলে সেটা সত্য। বন্ধু আমাদের মাঝে না থাকলেও এখনো বন্ধু আমার হৃদয়ে বেঁচে আছে। আমার সেই বন্ধু ছিলেন আমার দাদা। ১৪ ফেব্রুয়ারী সবার কাছে ভালোবাসা দিবস হিসেবে সমাদৃত হলেও এই দিনটি আমার কাছে বাকি দিনগুলোর চেয়ে কষ্টের। মানুষ মরণশীল কিন্তু বন্ধুত্ব অমর এটা বন্ধু সেদিন নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়েছেন।
