ছোট থেকে আমি ছিলাম দুরন্ত গেঁছো মেয়ে। তাই যদিও আমি মেয়ে তাও মেয়েলি কাজে এতো পারদর্শী ছিলাম না। মেয়েলি কাজ বলতে আমি বুঝিয়েছি রান্নাবান্না, সেলাই এসব কে। আসলে কাজের লিঙ্গবেদে কোনো পার্থক্য হয় কিনা আমার জানা নেই। তাও আমাদের সমাজ এমনই বলে। চাষের কাজ,গাছে উঠা,সাইকেল চালানো, মাছ ধরা এসব কাজে আমি দক্ষ। এমন কি আমি বাজারও করতাম যদিও তখন গ্রামে মেয়ে কিংবা মহিলা কেউই বাজারে যেতো না।মেয়েলি কাজ না করতে পারলেও আমার এসব কাজের প্রতি আকর্ষন ছিলো।
আমার এক চাচাতো বোন নাম রোজি সে আমার সাথে একি শ্রেণীতে পড়তো।খুব ভালো না হলেও বন্ধুত্ব ছিলো।ওদের বাড়ি রাস্তার পূর্ব পাশের উত্তর দিকে আর আমাদের বাড়ি রাস্তার পশ্চিম পাশের দক্ষিণ দিকে।তাই একি পাড়া হলেও অনেকটা দূর আমাদের বাড়ি থেকে ওদের বাড়ি।ও মাঝে মাঝে বিকেল বেলা আমাদের বাড়িতে আমার সাথে দেখা করতে আসতো।
ও যখনি আমাদের বাড়িতে আসতো তখনি কুশিকাটার কোনো কিছু বানাতে বানাতে আসতো।তখন ওর বয়স বারো বছরের মতো হবে। আমার বয়সও তখন দশ বছর।একি শ্রেণীতে পড়লেও সে আমার থেকে কিছুটা বড়।ও খুব ভালো কুশিকাটার কাজ পারতো।কখনো গেঞ্জি, কখনো জামার গলা,জুতা,বেল্ট অনেক কিছু বানাতে বানাতে আসতো। ও আবার আমার সাথে বলতো দেখ এইটা ময়ূর ডিজাইন, এটা মাকড়সা ডিজাইন এসব শুনে আমার খুব আকর্ষণ লাগতো। আমি যদি বানাতে পারতাম।আমি ওকে বলতাম আমাকে শিখাবে।ও বলতো আচ্ছা। আর শিখিয়ে দিতো না। অন্য দিন আবার বলতাম ও বলতো তুমি কুশি কিনো তারপর শিখাবো।এভাবে দিন কেটে গেলো। অষ্টম শ্রণীতে ওঠার পর ওর বিয়ে হয়ে গেলো। আমার কুশি শিক্ষা স্বপ্ন হয়ে গেলো।এর পর আর কাউকে পায়নি।
আবার যখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলাম তখন নতুন এক জন বান্ধবী হলো সে বলে কুশি পারে। আমার স্বপ্নের কথা শুনে সে খুব হাসলো কুশি শিক্ষা কারও স্বপ্ন হতে পারে এটা সে ভাবতেই পারে না। আমি আবার ওকে মন খারাপ করে বললাম দেখো শখের দাম লাখ টাকা।আর এটা আমার শখ তাই এটা আমার স্বপ্ন। আমি অবশ্য কুশির কাজ শিখবো।এ কথা শুনে ও বললো আমাকে কুশির কাজ শিখাবে।এরপর একদিন ও কুশিকাটা,সুতা নিয়ে আসলো। ক্লাসের ফাঁকে শিখাবে।ঐ দিন টিফিন টাইমে অল্প শিখিয়েছে। বললো পরের দিন আবার আনবে ওর নাকি আর মনে থাকে না।এভাবে ফাস্ট ইয়ার শেষে ওর বিয়ে হয়ে গেলো।ও আর কলেজে আসেনি। আমারও আর কুশি শিখা হলো না।এরপর ঢাকা চলে আসলাম কুশি শিখার আর সময় কোথায় পড়ালেখা, টিউশনি নানা ব্যস্ততা। তার উপর শিখাবে এমন কাউকে ও পায়নি। মালয়েশিয়া আসার পর আমার হাজবেন্ডকে এসব বললাম ও বলে মালয়েশিয়া তে কুশি পাওয়া যায় আমি এনে দেবো। আমি ওকে আনতে বললাম। ভাবলাম একদিন শিখেছিলাম চেষ্টা করলে পারবো।ও আর মনে করে আনেনি।
দুইহাজার বিশ সালে যখন লকডাউন দিলো ও বললো অনেক দিন ঘরে বসে থাকতে হবে চলো কুশিকাটা আর সুতা নিয়ে আসি তুমি শিখতে চেষ্টা করতে পারবে। তারপর ও একটা বড় প্যাকেট নিয়ে আসলো ত্রিশ রঙের সুতা কুশিকাটা তিনটা। দেখে আমি বলি এতো দেখি মশা মারতে কামান দাগা।এমনিতেই পারিনা এতো দিয়ে কি করবো।তারপর ভাবলাম ইউটিউবে খুঁজে দেখি। ওমা এ যে বিশাল ট্রেনিং স্কুল।একদিনে শিখে নিলাম আমার স্বপ্নের কুশিকাটার কাজ।বেসিক শিখার পর একটা টুপি বানাতে চেষ্টা করলাম ওমা সুন্দর এক টুপি হয়ে গেলো।এরপর আরও একটা টুপি বানালাম।এখন আমি মোটামোটি কুশিকাটা দিয়ে সবই বানাতে পারি।
কুশিকাটার কাজ শিখতে পেরে আমি সত্যি সত্যি আনন্দিত। আর আমার এই স্বপ্নটা যার জন্য সত্যি হয়েছে, আমার স্বামী, তাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
আসলে একটা কথা আছে যে মন থেকে তুমি যদি কিছু চাও তা অবশ্যই হবে।

ছোটবেলা থেকে কুশিকাটার কাজ শেখার অনেক শখ ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর শেখা হয়ে ওঠেনি। আপনার কাজগুলো ভীষণ সুন্দর হয়েছে। ধন্যবাদ আমাদের সাথে সুন্দর একটি পোস্ট শেয়ার করার জন্য।
Congratulations @setararubi! You have completed the following achievement on the Hive blockchain and have been rewarded with new badge(s):
Your next target is to reach 900 upvotes.
You can view your badges on your board and compare yourself to others in the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOP
Check out the last post from @hivebuzz:
Support the HiveBuzz project. Vote for our proposal!