আমি মাধবীলতা।দিন মুজুর বাবার একমাত্র রূপবতী কন্যা।নিজেকে রুপবতী বলায় অনেকে, অনেক কিছু ভাবতে পারেন।তবে হ্যাঁ এটা আমার কথা নয়।সবাই বলে আমি নাকি খুব সুন্দরী তাই বললাম। গরিবের সুন্দরী মেয়ের উপর সবার নজর থাকে। মা-বাবা যদি শক্ত হয় তাহলে এ নজর কোনো ক্ষতি করতে পারেনা কিন্তু আমার মা-বাবা যে শুধু গরিব তা নয় আমি তাদের শেষ বয়সের সন্তান। একেতো নুন আনতে পান্তা পুরুই তার উপর আমাকে নিয়ে সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।তাই আমার যখন এগার বছর বয়স তখন আমাকে আমার থেকে সতেরো বছরের বড় চাচাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে দেয়।ওনি আমাদের গ্রামের বাজারে ব্যবসা করেন। লেখাপড়া বলতে প্রাথমিক বিদ্যালয় পাশ দিয়েছেন। এটাই নাকি আমার কপালের তিলক এতো ভালো বর পেয়েছি।
আমার শ্বাশুড়ী আমাকে প্রায়ই বলতেন আমি নাকি রাজ কপাল নিয়ে জন্মেছি তাই ওনার ছেলের মতো রাজ পুত্র আমাকে বিয়ে করেছে।আমার বয়স তখন এগারো তাই আইন অনুসারে বিয়ে সম্ভব হয়নি। কবুল করে বিয়ে হয়েছে। তাই আমি আমাদের বাড়িতে থাকতাম।অবশ্যই একি বাড়ি শুধু ঘর আলাদা।রাতে আবার স্বামীর ঘরে ঘুমাতাম। দিনের বেলা ওদের ঘরে কম যেতাম কারণ ভয় ছিলো কেউ দেখে নিবে। ইউনিয়ন পরিষদে অভিযোগ করলে সমস্যা।
আমি তখন খুব ছোট তেমন কিছু বুঝতাম না।কিন্তু আমার শ্বাশুড়ী আর ননদ সামান্য কিছু ভুল হলে আমাকে কথা শুনাতে ছাড়তেন না।আমার বর প্রথম দিকে কিছু বলতেন না। একদিন রাতে কি যে হলো আমি জানি না তিনি আমাকে ডেকে বললেন "ছোট বেলা থেকে ঠিক মতো খেতে পারতে না এখন পেয়েছো নিজে খাও ঠিক আছে সব কিছু বুড়াবুড়িদের কাছে পাচার করোনা"।
বুড়াবুড়ির দায় আমি নিতে পারবো না।আমি কিছু বলিনি সেদিন চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
হ্যাঁ আমি দিন মুজুরের মেয়ে কিন্তু আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান। অনেক ভালোবেসে বড় করেছেন আমায়।আমার বাবা মাছ কিনতে না পারলে আশেপাশের ডুবা থেকে মাছ ধরে এনে খাইয়েছেন।নিজে না খেয়ে তিনবেলা মাছ দিয়ে ভাত দিয়েছেন আমাকে। শত অভাবেও মুরগি বিক্রি করেনি, আমাকে খাইয়েছেন।সেই মা-বাবা কে নিয়ে এধরণের কথা যেনো আমার হৃদয় কে বিদির্ণ করেছে। এরপর থেকে আমার বর প্রায়ই আমার মা বাবার নামে খারাপ কথা বলতো। আমি সহ্য করতাম। আমার সব কষ্ট আমার মাঝে চাপা দিতাম কারণ আমার মা বাবা এসব শুনলে কষ্ট পাবে।হঠাৎ একদিন আমার বর আমাকে বলছে হাভাতে ঘরে বিয়ে করলে এমনি হয় বৌয়ের চোখ সংসারে থাকে না থাকে স্বামীর সম্পদের উপর।কিভাবে বাবার বাড়িতে পাচার করবে।
কি জন্য আমার বরের মনে হয় আমি আমার বাবার ঘরে সব পাচার করি জানি না। অথচ আমি আমার বাবার ঘরেই বেশি খায়।ছোট্ট সে আমার আত্ম সম্মানে ঘা লাগে সেদিন। যদিও আত্মসম্মান শব্দটা সেদিন আমার জানা ছিলোনা।সেদিন স্বামীর ঘর থেকে গিয়ে মাকে বলেছিলাম আমি আর ওদের বাড়িতে যাবো না। কেনো যাবোনা জিজ্ঞেস করলে চুপ করে বসে ছিলাম।কোনো উত্তর দিলাম না।মা ভেবেছিলো কোনো বিষয়ে রাগ হয়েছে তাই বলছি, একটু পর সব ঠিক হয়ে যাবে। রাতে আমার ননদ ডাকতে আসে, "মাধবী কোথায় এখনো যায়নি কেনো।এভাবে চলে আসবে রান্না করতে হবে না?মা রান্না করে রাখবে ও কি শুধু গিয়ে খাবে।"
ও আমার ননদ কিন্তু আমার থেকে দশ বছরের বড় তাই আমাকে নাম ধরে ডাকে।আবার চাচাতো বোনও।মা ওকে বললো তোমাদের বাড়ি থেকে এসে এভাবেই বসে আছে, কিছু কি হয়েছে?আমার ননদ বলে উঠলো কি আবার হবে। ঢং দেখলে বাঁচিনা।ও চলে গেলো । আবার আমার শ্বাশুড়ী আসলো তাই আমি ঘর থেকে বের হলাম না। এবার আমার বর আসলো ডাক দেওয়ার পর আমিও বাইরে এলাম।ওনার চোখের দিখে তাকিয়ে বললাম। আমি চলে এসেছি এবার ভালো একটা বিয়ে করো।দেখো আবার হাভাতে ঘরের মেয়ে এনোনা।বলে আমি ঘরে চলে গেলাম।এর পরদিন থেকে সবাই আমাকে বুঝাতে লাগলো বিয়ের গুরুত্ব।
ইচ্ছে করলেই বিয়ে ভাঙা যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। দিনের পর দিন মা-বাবাকে কিভাবে অপমান করেছে এটা ছাড়া কিছুই আমার মাথায় ঢুকতো না। ওরা চেয়ারম্যান, মেম্বার ডেকে সালিসের ব্যবস্থা করে আমাকে সেখানে ডাকলে স্পষ্ট বলে দেয় আমি যাবো না।আমার বাবা একথা শুনে আমাকে মারতে আসে, মারতে আসে বললে ভুল হবে চড় থাপ্পড় মেরে দেয়।এরপরও যখন আমি রাজি হইনি তখন মৌখিক তালাকের মাধ্যমে ইতি টানে আমার বিয়ে নামের এক প্রহসনের।বাল্য বিবাহ তাই আইনি কোনো ঝামেলা ছাড়াই তালাক সম্পন্ন হলো।আমি আবার পড়াশোনা শুরু করি।
এসএসসি এইচএসসি পাশ করে আমি এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। টিউশনি করে নিজের পড়ালেখায় খরচ করে মা বাবাকে প্রতিমাসে কিছু টাকা পাঠাতে পারি।আমি ভালো আছি, সত্যিই ভালো আছি।ও হ্যাঁ আমাদের সমাজ এখনো এতো উন্নত হয়নি যে আমাকে সহজ সরল ভাবে মেনে নেবে।তাদের কাছে আমি তালাক প্রাপ্ত নারী। যেনো নারী নই অন্য কোনো প্রাণী।অবশ্যই এতে আমার কিছু যায় আসে না।আমার আমি আমার কাছে ভিষণ দামী।

আসলে বয়স বেশি হওয়ার পর বা অনেক শিক্ষিত হওয়ার পর বিয়ে হলেই যে সাংসারিক জীবন সুখের হবে,শ্বাশুড়ি বা ননদ,স্বামী অত্যাচার করবে না তার নিশ্চিয়তা কি?
কারণ জরিপে দেখা গিয়েছে,শিক্ষিত সমাজে দাম্পত্য কলহ যেমন বেশি বিবাহ বিচ্ছেদও তেমন বেশি।
এই সমস্যা সামাধানে শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না,সমাজকে নৈতিকতা শিখতে হবে,সামাজিক পরিবর্তন দরকার,সমাজের মানুষের মনের পরিবর্তন দরকার।
সহমত! পরিবর্তন দরকার মানসিকতার...
আসলে এটা একটা বাস্তব কাহিনির উপর ভিত্তি করে লিখেছি,কেউ একজন এতো চড়াই-উতরাই পার করে সফল হতে পেরেছে সেটাই আমার গল্পের মূল বিষয় ছিলো।
Congratulations @setararubi! You have completed the following achievement on the Hive blockchain and have been rewarded with new badge(s):
Your next target is to reach 20 posts.
You can view your badges on your board and compare yourself to others in the Ranking
If you no longer want to receive notifications, reply to this comment with the word
STOP
To support your work, I also upvoted your post!
Check out the last post from @hivebuzz:
Support the HiveBuzz project. Vote for our proposal!
মেয়েদের এতো ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া আমার পছন্দ নয়। যে বয়সে সে ঘুরে বেড়াবে সেই বয়সে মেয়েটা কি পারবে পরিবারের ভার নিতে? এই বয়সে সে আর বুঝেই বা কি।
আগে দেখা যেতো গ্রামের মেয়েদের ছোট বয়সেই বিয়ে হয়ে যেতো। তবে এখন এই প্রথার পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে৷
পরিবর্তন হইতো এসেছে কিছু কিছু জায়গায়,তবে এখনও গ্রামে এসএসসির পাশের পর আর কোন মেয়ে অবিবাহিত থাকে না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে,যাদের মা-বাবা শিক্ষিত তারা হয়তো পড়ালেখা করতে পারে, বিয়ে পরে হয়।
তবে যাইহোক,এইসবক্ষেত্রে পরিবর্তন সত্যিই দরকার।
এসএসসির পর বিয়েতে আমি সমস্যা দেখিনা। বিয়ে করলেই যে সব সমস্যা তা কিন্তু নয়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ৯০% ছেলেমেয়ে পাপাচারে লিপ্ত। ধর্মীয় দৃষ্টিগুন থেকে আগে বিয়ে হয়ে যাওয়াই ভালো। তবে সেটা ১৭/২০ বছরের আগে নয়!